গবেষণায় জীবনের কাল!


OLYMPUS DIGITAL CAMERA

বিজ্ঞানীদের কাছে গবেষণা যেন নেশার মত। তাইতো সমাজ সংসার ত্যাগ করে শুধু গবেষণাকেই আপন করে নেন তারা। কেউবা আবার গবেষণার কাজে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন, এমনকি জীবন উৎসর্গ করেছেন। ফলে অনেকে আহত আবার নিহত হয়েছেন। এমনই কয়জন শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের নিয়ে আমাদের বিশেষ  আয়োজন।

Karl Scheele-2

কার্ল সিলি একজন বিখ্যাত ফার্মাসিস্ট রসায়নবিদ। তার উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার অক্সিজেন (যদিও প্রিসটলি প্রথম প্রকাশ করেন), মলিবডেনাম, টাংস্টেন, ম্যাঙ্গানিজ এবং ক্লোরিন। পাস্তুরাইজেশনের সাদৃশ্যপূর্ণ একটি পদ্ধতি তিনি আবিষ্কার করেন। নতুন আবিষ্কৃত উপাদান জিহ্বা দিয়ে তিনি পরীক্ষা করতেন। হাইড্রোজেন সায়ানাইড আবিষ্কারের পর জিহ্বা দিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়েই ঘটে আসল বিপত্তি। মারকারির বিস্ক্রিয়ায় এই বিখাত বিজ্ঞানী মৃত্যুবরণ করেন।

Jean-Francois De Rozier 2

জিন ফ্রাঙ্কিস ডি রজার  পদার্থ ও রসায়নের শিক্ষক ছিলেন । খুব অভিজান প্রিয় ছিলেন তিনি। ১৭৮৩ সালে তিনি বেলুনে চড়ে ভ্রমণের ইচ্ছে করেন। সঙ্গী হিসেবে নেন ভেড়া, মুরগী ও হাঁস। একটি গরম বায়ুপূর্ণ বেলুনে চড়ে তিন হাজার ফুট উপরে উঠতে সক্ষম হন তিনি। কিন্তু  ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ডে যেতে চাইলেন তিনি। গরম বাতাস এবং গ্যাস ভর্তি বেলুন ভালোই উড়ছিল। হয়তোবা এটাই ছিল তার শেষ অভিযান। ১৫০০ ফুট উঠার পর বেলুন ফেটে যায় এবং ভূমিতে পরে মৃত্যুবরণ করেন। খুব সম্ভবত ৮ দিন পর তার বাগদত্তা আত্মহত্যা করে।

Sir David Brewster

স্যার ডেভিড ব্রেসটার ছিলেন একজন স্কটিশ বিজ্ঞানী। তিনি একাধারে একজন গবেষক এবং লেখক। আলো এবং দৃষ্টি ছিল তার গবেষণার বিষয়। মানুষের দৃষ্টির সাথে আলোর সম্পর্ক নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। বহু বছর ধরে শিশুদের কাছে জনপ্রিয় কালাইডস্কোপ নামক খেলনা আবিষ্কারের জন্য তিনি বিখ্যাত। ব্রেসটার ১৮৩১ সালে একটি রাসায়নিক গবেষণা করেন যা তার অন্ধত্তের মূল কারণ। যদিও তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছিলেন কিন্তু চোখের ঘা নিয়ে লড়েছেন আমৃত্যু পর্যন্ত।

Elizabeth Ascheim

এলিজাবেথ আসিম যার বদৌলতে সান ফ্রান্সিসকোতে প্রথম এক্সরে গবেষণাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মায়ের মৃত্যুর পর আসিম ডা. উলফকে বিয়ে করেন । ডা. উলফের চিকিৎসাশাস্ত্রে প্রশংসনীয় অবস্থানের কারণেই বিয়ে করেছিলেন তিনি। রন্টজেন এর নতুন আবিষ্কৃত এক্সরের প্রতি খুবই আগ্রহী ছিলেন ডা. উলফ। তড়িৎবিদ্যায় অভিজ্ঞ এলিজাবেথও এই বিষয়ে সমান আগ্রহী ছিলেন। তিনি তার স্বামীর অফিসে একটি এক্সরে মেশিন নিয়ে আসেন এবং এটি সঞ্চালন করতেন। তার স্বামীর সাথে তিনি অনেক বছর ধরে এক্সরে মেশিন নিয়ে গবেষণা করেছেন। কিন্তু এক্সরে রশ্মির নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব তারা অনুধাবন করেন নি। ফলে এলিজাবেথ এর শরীরে এক্সরে রশ্মির প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ক্যান্সারে আক্রান্ত হন তিনি এবং পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করেন।

Alexander Bogdanov

অ্যালেক্সান্ডার বোগডানভ একজন রাশিয়ান শরিরতত্তবিদ, দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ এবং  সায়েন্স ফিকশন লেখক। একজন মানুষের শরীর থেকে অন্য মানুষের শরীরে রক্ত সঞ্চালন নিয়ে গবেষণা করেছেন তিনি। চির যৌবন ধরে রাখতে রক্ত সঞ্চালন নিয়ে তিনি ১৯২৪ সালে গবেষণা শুরু করেন। তিনি তার শরীরে এগারো বার রক্ত গ্রহণ করেন এবং ঘোষণা করেন তার চুল উঠা দূর হয়েছে এবং দৃষ্টি শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বোগডানভের গবেষণা সম্পূর্ণ ছিল না। তিনি রক্তদাতাদের রক্ত পরীক্ষা না করে গ্রহণ করতেন। যার ফলে ১৯২৮ সালে তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন এবং এর কিছুদিন পরেই মৃত্যুবরণ করেন।

Robert Bunsen 2

রবার্ট বুনসেন এর নামানুসারেই বুনসেন বারনার এর নামকরণ যা গবেষণাগারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার গবেষণা শুরু জৈব রসায়ন দিয়ে। গবেষণাগারে বিভিন্ন উপাদান নিয়ে তিনি গবেষণা করতেন। তিনি যখন আয়োডাইল সায়নাইড গবেষণা করেন তখন তা বিস্ফোরিত হয় এবং তার এক চোখ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে তিনি গবেষণার বিষয় পরিবর্তন করেন। নতুন বিষয় হিসেবে বেছে নেন অজৈব রসায়ন।

Sir Humphrey Davy 1c

স্যার হামফেরি ডেভি একজন ব্রিটিশ রসায়নবিদ এবং গবেষক। বৈজ্ঞানিক কর্মজীবনের প্রতি  তার অনেক ক্ষোভ ছিল। তরুণ গবেষক হিসেবে তিনি ওষুধ প্রস্তুত কোম্পানিতে যোগ দেন। কিন্তু রাসায়নিক বিস্ফোরণ ঘটানোর ফলে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। রসায়নবিদ হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত করার পর থেকে তিনি বিভিন্ন গ্যাস নিয়ে পরীক্ষা চালাতেন। পাশাপাশি তিনি একটি অভ্যাসে জড়িয়ে পরেছিলেন। আর তা হচ্ছে নতুন পরীক্ষিত কোন গ্যাসের শ্বাস নেওয়া। নাইট্রাস অক্সাইডের চেতানানাশক ধর্ম নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। এক্ষেত্রেও তিনি গ্যাসের শ্বাস গ্রহণ করেন। এই অভ্যাসই তার মৃত্যুর কারণ ছিল। গ্যাসীয় বিষক্রিয়ার ফলে দুই দশক ধরে তার শরীর অক্ষম ছিল। একই সাথে নাইট্রোজেনtrchloride বিস্ফোরণে তার দুটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়।

Michael Faraday 3

মাইকেল ফারাডে (farade) যিনি স্যার হামফেরির অন্ধত্তের ফলে তার স্থলাভিষক্ত হন। তিনি হামফেরির তড়িৎ পদ্ধতি উন্নত করেন এবং তড়িৎ চৌম্বক ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা করেন। দুর্ভাগ্যক্রমে তিনিও হামফেরির মত নাইট্রোজেন ক্লোরাইড বিস্ফোরণের শিকার হন। ফলে তার চোখের মারাত্মক ক্ষতি হয় এবং বাঁকী জীবন ক্লোরিন বিষক্রিয়ায় কাটিয়েছেন।

Marie Curie 3

মেরি কুরি যিনি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা অধ্যাপক। তিনি একসঙ্গে পদার্থ ও রসায়নে নোবেল পেয়েছেন। ১৮৯৮ সালে তিনি এবং তার স্বামী রেডিয়াম আবিষ্কার করেন।  সারা জীবন তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা করেছেন তিনি। আর নিয়ন্ত্রহিনভাবে বিকিরিত তেজস্ক্রিয় রশ্মির ফলেই তিনি লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হন এবং ১৯৩৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

Galileo Galilei

গালিলিও গালিলি (Gallio gallili) আধুনিক পদার্থবিদ্যার জনক। তিনি অদৃশ্যমান দূর বস্তুকে দেখার জন্য টেলিস্কোপের সুক্ষতা নিয়ে কাজ করেছেন। সূর্যের প্রতি তিনি অনেক বেশি আগ্রহী ছিলেন। ফলে সূর্যের দিকে ঘণ্টার পর  ঘণ্টা   তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করতেন তিনি। ফলে জীবনের শেষ চারটি বছর অন্ধভাবে কাটাতে হয়েছিল তাকে।

বিশেষঃ

Louis Slotin 1

লুইস স্লোটিন একজন কানাডিয়ান বিজ্ঞানী যিনি মানহাটান প্রোজেক্ট নিয়ে কাজ করেছেন। এরই অংশ হিসেবে একটি বিশেষ তড়িৎ গোলকের উপর বেরিলিয়াম গোলক নিক্ষেপ করেন। রুমে অবস্থানকারী অন্য বিজ্ঞানী বাতাস আয়নায়নের জন্য নীল শিখা প্রদর্শন করেন এবং তাপ অনুভব করেন। স্লোটিন দ্রুত বাইরে আসেন এবং অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার সহকর্মীরা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এর মাত্র নয় দিন পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

উত্তর প্রদান করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s