পৃথিবীতের উদ্ভিদের সংখ্যা ৩ লাখ ৯০ হাজার ৯০০ !!


_89622290_droseramagnificainhabitat_3_photobypaulogonella
আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে বড় সহায়ক হল উদ্ভিদ। প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত অক্সিজেন আমরা পায় উদ্ভিদ থেকে। শুধু তাই নয় পুরো পৃথিবীকে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় বজায় রাখা, প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষায় উদ্ভিদের বড় ভূমিকা রয়েছে। বৈচিত্রময় এই পৃথিবীতে আমাদের উপকারী এই বন্ধুর সংখ্যা কি আমরা জানি? সারা বিশ্বে মানুষের সংখ্যা কত তা জানা যেমনটা জরুরী, তেমনি উদ্ভিদের সংখ্যা জানাও জরুরী। তবে উদ্ভিদের বৈচিত্রতা এত বেশি যে সঠিকভাবে উদ্ভিদের সংখ্যা নির্ণয় করা খুবই জটিল কাজ। তবে বিজ্ঞানীরা বসে নেই। তারা প্রতিনিয়ত উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা করছেন। জানার চেষ্টা করছেন আমাদের এই পৃথিবীতে কত সংখ্যক উদ্ভিদ রয়েছে। স্থলভাগে যেমন রয়েছে অসংখ্য জানা অজানা উদ্ভিদ, তেমনি সমুদ্রের অভ্যন্তরে তথা জলভাগে কত উদ্ভিদ রয়েছে তার ইয়াত্ত নেই। সম্প্রতি সারা বিশ্বের উদ্ভিদের সংখ্যার তালিকা প্রকাশ করেছে রয়েল বোটানিক্যাল গার্ডেনের বিজ্ঞানীরা। তাদের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী  সারা বিশ্বে ৩,৯০,৯০০ টি উদ্ভিদ রয়েছে। সারা বিশ্বের ফ্লোরা সম্পর্কে এটিই প্রথম কোন সম্পূর্ণ গবেষণা । মূলত প্রতিবছর সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন উদ্ভিদ অনুসন্ধানে নিরলস গবেষণা করে থাকেন।

_89648557_02_newplantdiscoveries_0311

বিজ্ঞানীদের মতে গড়ে পাঁচটির মধ্যে একটি উদ্ভিদ হুমকির সম্মুখীন

তারাই ধারাবাহিকতায় তথ্য উপাত্তগুলো যাচাই বাছাই করে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। দেখা গেছে শুধুমাত্র ২০১৫ সালেই বিজ্ঞানীরা ২,০৩৪ টি নতুন উদ্ভিদের সন্ধান লাভ করেছেন। তবে যে সংখ্যক উদ্ভিদ সম্পর্কে জানা গেছে তার শতকরা ২১ ভাগ হুমকির সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থল পরিবেশ বিনষ্ট, বিভিন্ন রোগ প্রধানত হুমকির প্রধান কারণ।  রয়েল বোটানিক্যাল গার্ডেনের সায়েন্স বিভাগের পরিচালক প্রফেসর ক্যাথি উইল বলেন “পৃথিবীতে কত সংখ্যক উদ্ভিদ রয়েছে, তাদের আবাসস্থল এবং বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে পারস্পারিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানাটা খুব জরুরী। কারণ এটি স্পষ্ট যে উদ্ভিদ আমাদের বেঁচে থাকার এক অবিচ্ছেদ্য উপাদান”। তিনি আরোও বলেন-“ উদ্ভিদ আমাদেরকে অক্সিজেন যোগান দেওয়ার পাশাপাশি সরাসরি খাদ্য, জ্বালানী, ঔষধ সরবরাহ করে”। তবে তালিকা  চূড়ান্ত করতে গিয়ে তাদেরকে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিজ্ঞানীদের পাঠানো তথ্য উপাত্তের চুলচেড়া বিশ্লেষণ করতে হয়েছে। দেখা গেছে একই উদ্ভিদ সম্পর্কে বিভিন্ন জন বিভিন্ন নামে তথ্য পাঠিয়েছেন।  শৈবাল,মসবর্গীয়,লিভওর্ট  (স্পোর উৎপাদনকারী উদ্ভিদ যাদের ফুল হয় না), হর্নওর্ট (ব্রায়োফাইটের অন্তর্ভুক্ত এক ধরনের উদ্ভিদ যাদের ভাস্কুলার তন্ত্র অনুপস্থিত) জাতীয় উদ্ভিদ ব্যাতিরেকে বিজ্ঞানীরা যে তালিকা প্রকাশ করেছেন তাতে দেখা গেছে পৃথিবীতে মোট ৩,৯০,৯০০ টি উদ্ভিদ রয়েছে। এর মধ্যে সপুষ্পক উদ্ভিদের সংখ্যা ৩,৬৯,৪০০ টি। এ সম্পর্কে প্রফেসর উইলস বলেন-“এটাতো শুধু স্থলভাগের চিত্র,এর বাইরো আরো কত উদ্ভিদ রয়েছে যাদের সম্পর্কে এখনো আমরা কিছুই জানি না”। তবে বিজ্ঞানীরা সবসময় নতুন নতুন উদ্ভিদ অনুসন্ধানে গবেষণা করে যাচ্ছেন। ২০১৫ সালে যে সকল নতুন উদ্ভিদ সম্পর্কে জানা গেছে তার মধ্যে সর্বোচ্চ উচ্চতার উদ্ভিদ হল এরষনবৎঃরড়ফবহফৎড়হ সধীরসঁস ।   পশ্চিম আফ্রিকার গেবন বনে জন্মানো এই উদ্ভিদের উচ্চতা ৪৫ মিটার। এই সকল উদ্ভিদ অনুসন্ধানে চীন, অস্ট্রোলিয়া ও ব্রাজিলের বিজ্ঞানীরা একযোগে কাজ করেছেন।

_89622292_begoniaruthiae-sabahjuliaanaksang

গত ১২ মাসে এমন ৯০টি নতুন বেগোনিয়া জেনাসের উদ্ভিদ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা

তাদের গবেষণায় প্রাপ্ত তালিকায় বেগোনিয়া জেনাসের ৯০ টি নতুন উদ্ভিদ রয়েছে। এছাড়াও পোঁকামাকড় ভক্ষণকারী উদ্ভিদ উৎড়ংবৎধ সধমহরভরপধ রয়েছে তাদের নতুন তালিকায়। তবে উদ্ভিদের তালিকা নিয়ে গবেষণার এখানেই শেষ নয়। বিজ্ঞানীরা তালিকা নির্ণয়ের পাশাপাশি পৃথিবীর উদ্ভিদকূল যে প্রতিকূল পরিবেশের সম্মুখীন হচ্ছে তা সম্পর্কে তথ্য উপাত্ত হাজির করেছেন। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছেন উদ্ভিদের আবাসস্থল বিশেষ করে ম্যানগ্রোভ ও অন্যান্য বনের পরিমাণ কমে যাওয়ার ফলে বিভিন্ন প্রজাতি বিরূপ প্রভাবের সম্মুখীন হবে। বিলুপ্তির  কারণ হিসেবে অন্যান্য কারণের মধ্যে তারা বিভিন্ন প্রকার রোগ,ক্ষতিকর পোকামাকড়ের প্রভাবকে দায়ী করেছেন। বিজ্ঞানীরা সাধারণত লাভজনক ও আমাদের প্রয়োজনীয় ফসলের রোগ নিরাময়ে গবেষণা করেন ও তা প্রতিরোধে বিভিন্ন প্রতিষেধক উদ্ভাবন করেন।

_89622295_c0218134-parrot_s-feather_myriophyllum_aquaticum_-spl

প্যারেট ফিদারের মত এমন আক্রমণকারী উদ্ভিদ বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের জন্য হুমকির কারণ

কিন্তু  বিভিন্ন বনে-জঙ্গলে জন্মানো হাজার হাজার উদ্ভিদের রোগ প্রতিরোধে কোন গবেষণা খুব একটা দেখা যায় না। এছাড়াও উদ্ভিদের বিভিন্ন প্রজাতি বিলুপ্তির জন্য আক্রমণকারী উদ্ভিদও দায়ী। দেখা যায় কোন একটি অঞ্চলে বছরের পর বছর কয়েক প্রজাতির উদ্ভিদ জন্মে। হঠাৎ করে সেখানে নতুন আক্রমণকারী উদ্ভিদ প্রজাতির আবির্ভাব হলে ঐ অঞ্চলের বাস্তুসংস্থানের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বিনষ্ট হয় এবং একসময় উদ্ভিদের বিলুপ্তি ঘটে। পৃথিবীতে বিজ্ঞানীরা এমন ৪৯৭৯ টি উদ্ভিদের সন্ধান পেয়েছেন যাদের উপস্থিতিতে অন্য উদ্ভিদ প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটে। এছাড়াও বিজ্ঞানীরা দেখেছেন আমাদের এই পৃথিবীর যে সকল অঞ্চল উদ্ভিদের উপস্থিথিতিতে সবুজ তার শতকরা ১০ ভাগ পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল। পরিবেশের সামান্য পরিবর্তনে এই সকল অঞ্চলের উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটে। এককথায় পৃথিবীতে উদ্ভিদের তালিকা নির্ণয়ের পাশাপাশি পরিবেশসহ বিভিন্ন প্রভাবে তাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিস্তারিত গবেষণা করেছেন। এটি প্রমাণ করে এই পৃথিবীতে মানব সভ্যতার সবচেয়ে উপকারী বন্ধু গাছ কতটা হুমকির সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবর্তিত হচ্ছে উদ্ভিদের জীবনধারা, আর ধ্বংসের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার উদ্ভিদ।
সূত্র: বিবিসি